শফিকুল রাজু’র গল্প ’শঙ্খচূড়’

Shafikul Raju

শঙ্খচূড়

গলতে কইলজা পুড়ার গন্দ পায় তুই পাছ না?

হঠাৎ স্থবিরতা নেমে এল।  বাতাসের শব্দ, নারকেল গাছের পাতার শব্দ, ঝোপের মধ্যে ঝিঁঝিপোকারা সব ঘুমিয়ে গেছে। এতো বড় বিলটা ভয়ঙ্কর নীরবতা নিয়ে পড়ে আছে। মাঝে মাঝে দুই একটা বড় মাছ অন্ধকারে জলের মধ্যে ঘোৎ করে উঠে তখন বিষণ্ন স্থির জলরাশি কলকল শব্দে ভেঙে পড়ে। চাঁদের রূপালী আলো পড়ে সেই জল চিকচিক করে। অন্ধকারে মশালের মতো জ্বলে থাকে হারানের চোখ। সেই চোখে চেয়ে থেকে চোখ ধরে আসে বাসন্তীর। সে পরাজিত সেনাপতির মতো পালিয়ে যেতে চায় কিন্তু তার পা যেন শেকড়ের মতো গেঁথে আছে মাটিতে। অস্বস্তির শীতল স্রোত নেমে যায় মেরুদণ্ড বেয়ে। খুব সাবধানে হারানের করা প্রশ্নটাকে পাশে কাটিয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে বাসন্তী, আমি গেলাম।

গাছের আধাঁরে মূর্তির মতো বসে থাকে হারান। পাশে শুয়ে থাকে রোয়া উঠা নেড়ি কুত্তাটা। চাঁদের দিকে মুখ করে বার কয়েক ডেকে উঠে পরক্ষণেই প্রভুর ব্যথা আঁচ করতে পেরে চুপ করে যায় ওটা। মাঝে মাঝে বিলের উপর থেকে ঠান্ডা বাতাস ছুটে আসে। ভিতরটা ভীষণ ফাঁকা, আরো ফাঁকা করে দিয়ে যায় বাতাসটা। হারানের মশালের মতো চোখ দুটো এখন বিলের মাঝে পদ্ম পাতার উপর জলের মতো টলটল করে। এই বুঝি টপ করে জল পরে যায়। জীবনকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিতে দিতে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে হারানের। শালার জীবন! যে জীবনের চার পয়সার দাম নেই সেই জীবন থাকার চেয়ে না থাকা ভাল। হারান বিকেলে গঞ্জ থেকে ফিরে বাসন্তীর ভিটেয় গিয়েছিল। হারানকে ভিটেয় দেখে মুখ ভেংচায় বাসন্তীর দাদি। মা মরা মেয়ে বুড়ির কাছে মানুষ। বাসন্তী একটু চোখের আড়াল হলেই বুড়ি চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে। হারান বলেছিল, দাদি বাসু কনে?
-ওই মুখপোড়া এ সাঁইঝে বেলায় আমার নাতনির খোঁজ করছ কেনে? মতলব টা কি?
-মতলব কিছু না। বাসুর লগে কথা আছিল।
-বাসুর লগে তর কিসের কথা? জলদি আমার ভিটে ছাড় কইছি নইলে মুখে ঝাটা দিব।

হারান আমতা আমতা করে। বুড়িরে সুবিধা মনে হয় না। সত্যি সত্যি ঝাটা তুলে নেয় আর মুদ্রণ অযোগ্য ভাষায় চেঁচামেচি করে। বেগতিক দেখে হারান ফিরে আসে। ঝুরি নামা প্রকাণ্ড বটগাছটার নিচে বসে থাকে।

লাল সূর্যটা মিয়িয়ে যায়। অন্ধকার নেমে আসে। হারানের সেদিকে খেয়াল হয় না। সে ভাবে অন্য কথা। মা থাইকলে আইজ বুড়ি এমন করতে পারত? ‘মা গেলে ওর বাপ কথা কইত। কিন্তু এহন ত আমারে মানুষই মনে করে না।’

হারান মায়ের কথা ভাবে। মার কথা ভেবে খুব জিদ হয়। ছয় বছর বয়সে বাপ হারিয়ে হারান সারাক্ষণ মায়ের আঁচলে আঁচলে থাকতো। তাদের ছোট ভিটায় ছোট একটা টিনের ঘর ছিল। চালাটা পুরনো ও ভাঙ্গা। চালার নিচে অন্ধকার ভ্যাপসা ঘরটা ভিষণ পছন্দ ছিল হারানের। মা দিনের বেলায় বাইরে কাজ করে যা পেত তা দিয়ে ভালোই তো চলছিল ভাবে সে। একদিন হল কি! রাত্রিবেলায় ঘুম ভেঙে যায়। হারান ঝাপসা চোখে অন্ধকারে কেমন একটা ছায়া দেখে। কিছুক্ষণ পর শুনা যায় মা কেমন যেন করছে। দাবড়ানো নিঃশ্বাসের শব্দ। অন্ধকার সয়ে এলে দেখে একটি লোক মায়ের বুকের উপর চেপে বসেছে। তাদের পায়া নড়া চকিটা ভূমিকম্পের মতো দুলছে। হারান তখন কিছুই বুঝে না। ঘুম জড়ানো চোখে সে ভাবে স্বপ্ন। তারপর আরও দু-তিন দিন সে মায়ের বুকে লোকটাকে দেখেছে। একদিন সন্ধ্যায় হারান মায়ের কাছে পড়তে বসেছে। হাঁটুর উপর শাড়িটা তোলা। পা ছড়িয়ে বসে মা উকুন মারছে। কুপির আলোতে মায়ের মুখে কি যে মায়া দেখছিল হারান। হারান ভাবলো মাকে রাত্রিবেলার কথাটা বলে। ‘মা হেই লোকডা কেডা?’
মা মাথা থেকে উকুন এনে দুই নখের মাথায় পুটুস করে মেরেই বলল, কেডা?
‘উই যে গেল রাইত আমাগো ঘরে দেখলাম।’
মা চোখ বড় বড় করে তাকায় কিছু বলে না। হারান উত্তরের আশায় মিটমিটে আলোয় মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। মা নির্বাক।

একদিন কী যে হলো ! এক সকালে উঠে দেখে মা নেই। কোথাও নেই। পালিয়েছে। ওই লোকটার সঙ্গে। সাত বছরের হারান কিছুই ভাবতে পারে না। উঠানে গড়াগড়ি করে কাঁদে। তবু মা আসে না। ওই লোকটা মাকে কেড়ে নিয়েছে। লোকটা তাকে বঞ্চিত করেছে। ওই লোকটা একটা সাপ।
রাতে ঘুমাতে গেলে মা গল্প বলত, আমি তখন ছোড। স্নান করে যখন ঘরে ফিরতাম তোর বাপ আমারে দেখত। সে কৃষ্ণচূড়া গাছডার নিচে থাইকা এমন কইরা চায়া থাকতো। আমার খুব সরম লাগতো। আবার ভালাও লাগতো। একদিন আমারে কইল, সে আমারে ভালবাসে। খুউব পছন্দ করে। সে আমারে বিয়া করতে চায়। তোর বাপ আর কি করলো জানস? আমাগো বাইত গটক পাঠাইল। তার গঞ্জে একটা দোকান ছিল, নিজের ভিটা ছিল। আমার বাপ গরিব মানুষ রাজি হইয়া গেল। কার্তিক মাসে বিয়া হইল আমাগো। তোর বাপ আমারে যে কি সোহাগ করত। বলতে বলতে চোখ ভিজে উঠে। মা থেমে থেমে আবার বলে, এক সন্ধ্যায় তোর বাপ গঞ্জ থাইকা ফিরতাছে। আমাগো বড় পুস্কুনির ধারে রাস্তায় একটা শঙ্খচূড় সাপ। তোর বাপ আন্ধারে তার লেজে পারা দেয়। সাপ কি আর বাচ বিচার করে? লগে লগে তোর বাপের পায়ে বিষ দিয়া দিল। এই সাপের বিষ খারাপ বিষ। লগে লগে ফেনা উইঠা মরলো মানুষটা। মা আবার কাঁদে। মার কান্নার সুরে হারানের ভয় ধরে যায়। হারান শঙ্খচূড়কে ভয় করে, ঘৃণাও করে।
ওই লোকটাও তাকে বঞ্ছিত করেছে। মাকে কেড়ে নিয়েছে। একটা শত্রু, একটা শঙ্খচূড়। হারান খিঁচিয়ে উঠে। খিস্তিখেউরে করে। নেড়ি কুকুরটা উঠে দাঁড়ায়। সেও প্রভুর সাথে হাঁক ছাড়ে। লেজ নাড়ায়।

ঝুড়ি নামা বটগাছের নিচে বসে হারান বাসন্তীর অপেক্ষা করছে। বাসন্তীর বাপটা জমের আত্মীয়। তার মেয়ের সাথে ভাব দেখলে খুন করবে। কিন্তু হারান যে বাসন্তীকে ভালোবাসে। বাসন্তীও। একদিন বিলের ধারে এমন চাঁদনীতে বাসন্তী বলল, তুই আমারে বিয়ে করবি?
হারান মাথা নাড়ে।
বাসন্তী আবার বলে, এহন বিয়ে করবি?
হারান কি বলবে বুঝে পায় না।
– বুঝেছি তুই একটা ভীতু। ভীতুর ডিম।
হারান যেন হঠাৎ করে ক্ষেপে যায়। ধপ করে জ্বলে উঠে ভিতরটা। ‘হারামজাদী আমি ভীতু?’
হারান লোহার মতো শক্ত হাত দুটি দিয়ে বাসন্তীকে জড়িয়ে ধরে। বাসন্তী চিৎকার করে। ‘এই কি করচিস?’
– বিয়ে করছি।
– সিঁদুর দিবি না?
হারান বাসন্তীকে ছেড়ে দেয়। দম নিতে নিতে বলে বাসন্তী, তুই একটা ডাকাইত।
হারান চেয়ে থাকে। বাসন্তী একটা কৌটা এগিয়ে ধরে বলে, আমি এই ডাকাইতটারে ভালবাসি।
হারান লাল সিঁদুর বাসন্তীর সিঁথিতে মাখিয়ে দেয়। এই কথা কেউ জানে না। শুধু এই গাছপালা, এই বিল, টলটলে জল, আকাশ, রূপালী জোছনা জানে।
বিলটা কি ভয়ঙ্কর নীরব। হারান বসে আছে। বাসন্তী লাল শাড়ি পরে এসেছে। তার মুখে কেমন থমথমে ভাব। বিকালের কথার ফোস্কাগুলো এখনো ভিষণ কামড়াচ্ছে। হারান বাসন্তীর মুখের উপর বলে উঠে, হগলতে কইলজা পুড়ার গন্দ পায় তুই পাছ না?
বাসন্তীর ভিতরটাও ছ্যাত্ করে উঠে। চোখ দুটি লাল হয়ে যায়। পানি টলটল করে। হঠাৎ স্থবিরতা নেমে আসে। অনেকক্ষণ পর ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে বাসন্তী, আমি গেলাম।
মুহূর্তেই আবার গর্জে উঠে হারান। ‘তুই আমারে মেরে তারপর যা। তুই কি আমার ব্যথা এটুকুনও বুঝিস না? নাকি বাপের মতো পাষণ্ড হয়েছিস?
হারানের কথাগুলো তীরের মতো বিঁধে। চোখের জল উপচে পরে। বিলের পানিতে যেমন চাঁদের আলো চিকচিক করে তেমনি বাসন্তীর চোখেও রূপালী আলো মুক্তোর মতো চকচক করে। শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে বাসন্তী চিৎকার করে বলে, তাইলে তুই আমারে নিয়ে যা। অনেক দূরে। যেখানে কেউ আমাগো খুঁজে পাবে না।
– ঠিক বলছিস।
– হু।

হারান শক্ত করে বাসন্তীর হাতটা ধরে। ‘এইযে ধরলাম। জান থাকতে কেউ ছাড়াইতে পারবি না।’
নীরবতা ভেঙে হেঁটে চলে তারা। ঝরে পরা শুকনো পাতারা মচমচ করে। একটা দমকা হাওয়া বিলের উপর থেকে ছুটে আসে। বাসন্তী কাঁদছে। চাঁদের আলোয় পথ চেয়ে বড় রাস্তায় উঠে ওরা। রাস্তাটা সোজা স্টেশনের দিকে গেছে। সেখানে গেলে যেকোনো ডাউনট্রেনে করে শহরে যাওয়া যাবে। বাসন্তী হারানের হাতটাকে শেষ আশ্রয় করে আকঁড়ে ধরে আছে। গঞ্জের মোড়টা পেরুতে পারলেই নিশ্চিন্ত। তখন কেউ ওদের ধরতে পারবেনা। ওরা রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলছে। ওদের সাথে ছুটে চলছে বাতাস, ছুটে চলছে নেড়ি কুকুরটাও। দূর থেকে ছায়া দেখা যায়। গঞ্জের মোড়ে বড় রাস্তায় কারা যেন দাঁড়িয়ে। ওদের চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসে। ছায়াগুলো সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নিকটে আসছে। সবচেয়ে উঁচু ছায়াটা চেনা যায়। পবন ঠাকুর। বাসন্তীর বাপ। প্রাণপণে চেষ্টা করেও কথা আসছে না। হারানের পিঙ্গল চোখে এখন আর ছায়াগুলোকে মানুষ মনে হয় না। মনে হচ্ছে আলো-আধাঁরিতে ফণা ধরে দাঁড়িয়ে শঙ্খচূড় সাপ।

লেখক: শফিকুল রাজু , কথাসাহিত্যিক ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা।

549 Views

Related posts

*

*

Top