দ্বিতীয় সত্তার সঙ্গে কথোপকথন-স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

দ্বিতীয় সত্তার সঙ্গে কথোপকথন

পর্ব-  ১ ও ২

শেষ রাতের তন্দ্রার ভেতর তুমি আমাকে প্রথম যে প্রশ্নটি করেছিলে তা ছিল এই : আমি উপন্যাস কেন লিখি? তোমার প্রশ্নের উত্তর আমি না দিলেও পারতাম। কারণ এই প্রশ্ন এত ক্লিশে, এত ক্লিশে যে―এর বিশেষ কোনো আবেদন এখন আর আছে বলে মনে হয় না। অন্তত আমার কাছে নেই। এই প্রশ্নের উত্তর পূর্বজ ঔপন্যাসিকরা দিয়ে গেছেন। তাই এ নিয়ে তাই নতুন করে কিছু বলার নেই।

তবু তোমার কৌতূহল নিবৃত্ত তো করতেই হবে। এই কথা তোমার জেনে রাখা দরকার, উপন্যাস একটা শিল্পকর্ম। মানুষের জন্য শিল্পের প্রয়োজন আছে। তুমি বলতে পারো, না, মানুষের জন্য শিল্পের কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষ পৃথিবীতে আসবে, খাবে, টয়লেট করবে, সঙ্গম করবে, সন্তানাদি উৎপাদন করবে, ঘুমাবে, তারপর মরে যাবে। ব্যস, হয়ে গেল। শিল্প দিয়ে কী করবে মানুষ? শিল্প না হলেও মানবজীবন চলে যাবে।

তোমার সঙ্গে আমার দ্বিমত আছে। তুমি কি আর্নস্ট ফিশারের নাম শুনেছ? অনেক বড় চিন্তক ছিলেন। তাঁর একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘দি নেসেসিটি অব আর্ট।’ বইটি পড়লে তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। ঐ বই থেকে সংক্ষেপে কয়েকটি কথা তোমাকে শোনাই, শোনো : ‘…মানুষ, যে কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষ হয়ে উঠল, যে প্রকৃতিকে রূপান্তর ও বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে প্রাণী জগত থেকে বেরিয়ে এলো, সে এভাবেই হয়ে উঠল এক জাদুকর, সামাজিক বাস্তবতার স্রষ্টা-মানুষ, সে সর্বদা মহান জাদুকর হয়েই থাকবে, সে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আগুন বহনকারী সর্বকালের প্রমিথিউস, সে সর্বকালের ওরফিউস, যে সঙ্গীতের মোহিনী মায়ায় প্রকৃতিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে জয় করে চলে। মানবতার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত শিল্পের মৃত্যু নেই।’

এখানে তুমি প্রশ্ন করতে পার, এই একুশ শতকে জ্ঞান-বিজ্ঞান যেভাবে উৎকর্ষের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তাতে একদিন মানবীয় উন্নতি চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। এই পৃথিবীতে মানুষ শাস্ত্রপ্রোক্ত স্বর্গকে নামিয়ে আনবে। এনে অনন্ত সুখকে আলিঙ্গন করবে। সব রকমের স্বপ্ন পূরণ হয়ে যাবে মানুষের। চাওয়া-পাওয়া বলতে তখন আর কিছু থাকবে না। তখন শিল্প কী উপকারে আসবে মানুষের?

এই উত্তরটাও তোমাকে আমি ‘দি নেসেসিটি অব আর্ট’ থেকে দিই : ‘…মানুষের অগ্রযাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটবে না কখনো, মানুষের অগ্রযাত্রা অন্তহীন বিকাশের পথে অব্যাহত থাকবে। সে যা হতে পারবে সবসময় তার চেয়ে বেশি কিছু হতে চাইবে, নিজের প্রকৃতিগত সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে সর্বদা বিদ্রোহ করবে, নিজেকে ছাড়িয়ে উঠবার জন্য সদা সচেষ্ট থাকবে এবং অমরত্ব লাভের সংগ্রামে লিপ্ত থাকবে সদা সর্বদা। মানুষের সবজান্তা, সর্বশক্তিমান ও সর্বব্যাপী হওয়ার ইচ্ছাটা যদি কখনো উধাও হয়ে যায়, তবে সে আর মানুষ থাকবে না। অতএব প্রকৃতির সম্ভাব্য সকল রহস্য ও সুবিধা উদঘাটন ও কাজে লাগানোর জন্য মানুষের সর্বদা বিজ্ঞানের প্রয়োজন হবে। আবার তার সর্বদা শিল্পের প্রয়োজন থাকবে শুধুমাত্র নিজের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধের জন্য নয়, বাস্তবতার যে অঞ্চল সে কেবল কল্পনায় জানে, যা এখনো তার করায়ত্ব নয়, সেখানে স্বাচ্ছ্যন্দ্য লাভের জন্য শিল্পের আবশ্যকতা থাকবে।’

আশা করি শিল্পের প্রয়োজনিয়তার ব্যাপারটা তুমি বুঝতে পেরেছ। এখন প্রশ্ন করতে পার, উপন্যাস কোন ধরনের শিল্প? উত্তরটা আমি র‌্যালফ ফক্স থেকে ধার করে দিই : ‘উপন্যাস হলো আমাদের সভ্যতার এক মহান লোকশিল্প, মহাকাব্যের একমাত্র উত্তরসূরী।…উপন্যাস হলো মানুষের জীবনের গদ্য। উপন্যাস হলো মানুষকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার এবং তাকে প্রকাশ করার প্রথম নান্দনিক প্রচেষ্টা।’ একই প্রসঙ্গে ক্রিস্টফার কডওয়েল কী দারুণ বলেছেন শোনো : ‘উপন্যাস এবং ঐকতানের জগতে মানুষের ধ্যান-ধারণায় জেগে ওঠে এক পরিবর্তমান ও প্রসারমান বিশ্বের বহু মানুষের বিভিন্ন আবেগের সমৃদ্ধ এবং বিচিত্র গতিধারা।’

এখন তুমি আমাকে প্রশ্ন করতে পার, আমি কেন উপন্যাস লিখি। উত্তরটা হচ্ছে এই, ‘আমি বিস্তর কথা বলতে চাই। আমার কথার পরিমাণ এত বেশি যে, শিল্পের অন্য কোনো মাধ্যমে―যেমন কবিতা, গল্প, নাটক, গান―তা ধরা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তাই আমি উপন্যাস লিখি। কিংবা এমনও হতে পারে, উপন্যাসে আমি কথা বলতে যতটা স্বচ্ছন্দ্য বোধ করি, শিল্পের অন্য কোনো মাধ্যমে ততটা করি না। তাই আমি উপন্যাস লিখি। কিংবা এমনও হতে পারে, গল্প শোনার আকাক্সক্ষা মানবসভ্যতার আদিম কাল থেকে আধুনিক কাল অবধি চলে আসছে। আমার রক্তের মধ্যে সম্ভবত সেই গল্পকারের রক্ত প্রবাহিত, আদিকালে যে গল্প শুনিয়ে মানুষকে বিমোহিত করত। আমি সম্ভবত তারই উত্তরাধিকারী।

 

দুই.

আমি বুঝতে পেরেছি, তুমিও উপন্যাস লেখা শুরু করতে চাচ্ছ। করতে পার। কিন্তু উপন্যাস লেখা তো আর ইট ভাঙার কাজ নয় যে, ইচ্ছে হলো আর অমনি একটা হাতুড়ি নিয়ে বসে পড়লে। সকালে ভাঙা শুরু করলে আর বিকেল নাগাদ কয়েক মণ ইট ভেঙে ফেললে। উপন্যাস মাটি কাটার কাজও নয় যে একটা কোদাল নিয়ে শুরু করে দেবে। উপন্যাস ওহী নয় যে তোমার কাছে নাজেল হবে। ইলহামও নয় যে হুট করে মনে আসবে আর হুট করেই তুমি লিখে ফেলবে। উপন্যাস লেখার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি।

কী সেই প্রস্তুতি? প্রথমে তুমি নিজের মুখোমুখি হও। দেখ, ফুলের গন্ধে তুমি বিমোহিত হও কিনা? প্রেমিকার চোখ তোমাকে বিস্ময়াভিভূত করে কিনা? শিশুর মুখ দেখে তোমার মধ্যে পবিত্রতার ভাব আসে কিনা? মানবতার অপমানে তুমি বেদনাবোধ করো কিনা? সমুদ্রের অপার সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি অসহায় বোধ করো কিনা? পাহাড়ের বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি বিহ্বল বোধ কর কিনা? কর্মব্যস্ত দিনের অন্তরালে তুমি কোনো হাহাকার শুনতে পাও কিনা? জরা ও মৃত্যুকবলিত মানুষের আর্তনাদ তুমি শুনতে পাও কিনা? রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে তুমি মহাবিশ্বের বিলাপ শুনতে পাও কিনা? কান পেতে শোনো, তোমার বুকের খাঁচায় বসে কেউ মুরলিতে বিরহের সুর তুলেছে কিনা? জীবনকে তুমি আঙুলের ডগায় নিয়ে লাটিমের মতো ঘোরাতে পার কিনা? জগতের সমস্ত অর্থ-বিত্ত তোমার কাছে অর্থহীন মনে হয় কিনা? তোমার মধ্যে এক ঋষি বাস করে কিনা, যে জগতের সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে নিজের সাধনার কাছে নত, স্বর্গের মোহময়ী অপ্সরীও তার ধ্যান ভাঙাতে পারে না। মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে তুমি তার অন্তরের কথা টের পাও কিনা?

উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে তোমাকে স্বাগতম হে বাল্মিকী-বেদব্যাসের উত্তরাধীকারী। তোমাকে স্বাগতম হে হোমার-দান্তের উত্তরাধিকারী। তোমাকে স্বাগতম হে তলস্তয়-দস্তয়ভস্কির উত্তরাধিকারী। তোমাকে স্বাগতম হে স্তাঁদাল-জোলা-লরেন্সের উত্তরাধীকারী। তোমাকে স্বাগতম হে ফকনার-হেমিংওয়ে-হুগোর উত্তরাধিকারী। তোমাকে স্বাগতম হে কামু-কাফকা-মার্কেজের উত্তরাধিকারী। তোমাকে স্বাগতম হে বঙ্কিম-বিভূতি-তারাশঙ্কর-মানিকের উত্তরাধীকারী। তুমি চোখ বন্ধ করো। নিজের ভেতরে ডুব দিয়ে তৃতীয় চক্ষুর উন্মীলন ঘটাও। অবাক বিস্ময়ে দেখ, তোমার মাথায় জগদ্বিখ্যাত মহান ঔপন্যাসিকরা তাঁদের সম্মিলিত হাত স্থাপন করে আছেন।

তারপর চোখ খোল। শুরু কর পাঠ। কিন্তু কী পড়বে তুমি? অবশ্যই বিশ্ব ভূগোলের প্রকৃত পৃষ্ঠাগুলো তোমাকে পড়তে হবে; যেসব পৃষ্ঠার ওপর শিল্প দাঁড়িয়ে, যেসব পৃষ্ঠা শিল্পের ভিত। কিন্তু সেসব পড়ার জন্যও প্রস্তুতির দরকার আছে। মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েই তো তুমি মাছ-মাংস খাওয়া শুরু করতে পারবে না। তোমাকে প্রথমে খেতে হবে হালকা খাবার। একইভাবে শুরুতে তোমাকেও হালকা পাঠ নিতে হবে। যেখানে যা পাবে সবই পড়বে। বাজারের ফর্দ থেকে শুরু করে দৈনিকের চিঠিপত্র কলাম, সব। বাদামঅলা তোমাকে যে কাগজে মুড়ে বাদাম দেবে, তাতে যা লেখা থাকবে তাও পড়বে। পড়তে পড়তে দেখবে তোমার মধ্যে পাঠের একটা নেশা তৈরি হয়ে গেছে।

এবার তুমি শুরু করবে বইয়ের পাঠ। মনে রেখো, জায়গা-জমির যেমন দলিল-দস্তাবেজ থাকে, তেমনি জ্ঞানেরও থাকে। বই হচ্ছে জ্ঞানের দলিল। বই পড়। যে কোনো বই। যা হাতের কাছে পাও। পড় আর সঙ্গে রাখ একটি খাতা। পড় আর ভালোলাগা অংশগুলো সেই খাতায় টুকে রাখ। পড় আর টুকে রাখ। টুকে রাখতে রাখতে দেখবে একদিন তুমি টোকা ছাড়াই নিজ থেকে অর্থাৎ নিজের ভেতর থেকে লেখার সাড়া পাচ্ছ। তুমি লিখতে পারছ। যা ইচ্ছে তাই  লেখ। যত খুশি তত লেখ। লেখ আর উল্লসিত হও। ভাবো, যে লেখাটি তুমি লিখেছ, পৃথিবীতে এর আগে কেউ এই লেখা লেখে নাই। ভাবো যে, তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখক। তোমার আগে লেখক হিসেবে কেউ আসেনি, পরেও কেউ আসবে না। তুমি শিল্পজগতের প্রেরিত পুরুষ।

তারপর ধীরে ধীরে পাঠের জালটাকে গুটাতে শুরু করবে। এবার তোমার পাঠ হবে সিলেক্টিভ। অর্থাৎ তুমি বিশ্বভূগোলের প্রকৃত পৃষ্ঠাগুলোর পাঠ শুরু করবে। কিন্তু কিভাবে বুঝবে এগুলোই যে প্রকৃত পৃষ্ঠা? বোঝার জন্য তুমি গুরুর শরণ নাও। মনে রাখবে, প্রত্যেক শিল্পই গুরুমুখী। গুরুকে নমস্কার দিয়েই কিন্তু তোমাকে শুরু করতে হবে। গুরুকে পরে না হয় তিরস্কার করো, কিন্তু প্রথমে নমস্কারটা তার কদমে রাখতেই হবে। গুরুই তোমাকে প্রকৃত পৃষ্ঠাগুলোর হদিস দেবে। গুরুর পরামর্শমতো পাঠ করো। পাঠ করতে করতে দেখবে তোমার প্যান্ট খুলে যাচ্ছে। তুমি অবোধ বালক হয়ে যাচ্ছ। কদিন আগে নিজের লেখা নিয়ে তোমার মধ্যে যে অহং তৈরি হয়েছিল, দেখবে, সেই অহং ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। তখন তোমার মধ্যে এক জেদ তৈরি হবে। ভাববে, আমাকেও তেমন লিখতে হবে, যেমন তুমি পড়ছ। এই জেদই তোমার লেখার উন্নতি ঘটাবে।

পাঠ অব্যাহত রাখ। যত পড়বে লিখবে তার বিশ ভাগের এক ভাগ। বিস্তর লিখতে হবে তোমাকে। নইলে লেখার হাত আসবে না। কে কী বলল, তাতে মোটেই কান দেবে না। তোমার যা খুশি তুমি তাই লিখবে। আর যত পড়বে তত ভুলবে। পড় আর ভুলে যাও। ভুলে যদি না যাও, পাঠের ঘেরে আটকা পড়বে তুমি। পৃথিবীতে বিস্তর পাঠক আছেন, যারা এক শব্দও লিখতে পারে না। কারণ তারা পাঠের ঘেরে আটকা পড়া মানুষ। তুমি তা নও। তোমাকে আটকা পড়া চলবে না। সব ধরনের বই পড়বে। তুমি অনেকটা মৌমাছির মতো। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম, সংস্কৃতি, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা, অধিবিদ্যা, সঙ্গীত, রাজনীতি, অর্থনীতি―এগুলো হচ্ছে তোমার কাছে একেকটি ফুলবাগান। এসব বাগান থেকে তুমি মধু আহরণ করে সঞ্চয় করবে মৌচাকে। সেই মৌচাকটির নাম উপন্যাস। অর্থাৎ জ্ঞানকা-ের শাখাগুলোর মধ্যে উপন্যাস এমন এক শাখা, যে সকল জ্ঞানকে ধারন করে। উপন্যাস আসলে প্রাচুর্যময় একটি শিল্পমাধ্যম।

তুমি যদি ভাব, আমি তো উপন্যাস লিখব, আমাকে দর্শন পড়তে হবে কেন? ইতিহাস পড়তে হবে কেন? রাজনীতি-অর্থনীতি বা বিজ্ঞান পড়তে হবে কেন? তাহলে তোমাকে দিয়ে উপন্যাস লেখা হবে না। কারণ, উপন্যাস এমন এক শিল্পমাধ্যম, যা সকল জ্ঞানকে ধারণ করে, বহন করে। তবে বেশি পড়বে পৃথিবীখ্যাত উপন্যাসগুলো। তাহলে তুমি উপন্যাসের গতিপ্রকৃতিটা বুঝতে পারবে। আর যখন তুমি নিজেই উপন্যাস লেখার মধ্যে থাকবে, তখন কিন্তু উপন্যাসের বাইরে অন্য কিছু পড়বে না। তাতে তোমার লেখার গতি বাধগ্রস্ত হতে পারে। পড়বে সেসব উপন্যাস, ভাষা ও আঙ্গিকের দিক থেকে যেগুলো ইউনিক।

 

লেখক- স্বকৃত নোমান, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

453 Views

Related posts

*

*

Top